বগুড়া ০২:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ৯ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
Logo কাহালুর বীরকেদার ইউনিয়নে বিএনপির গণ-সংযোগ ও লিফলেট বিতরণ অনুষ্ঠিত Logo কাহালুর শেখাহার দ্বি-মূখী উচ্চ বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ Logo আদমদিঘীতে সড়ক দুর্ঘটনায় এক শিশু নিহত Logo বগুড়ায় মাসিক কল্যাণ সভায় শ্রেষ্ঠ নির্বাচিত শেরপুর থানা Logo র‍্যাবের যৌথ অভিযানে আটক ৬ Logo বগুড়ায় ছুরিকাঘাতে এক যুবক নিহত Logo কাহালু প্রেসক্লাবের নতুন কমিটি গঠন সম্পর্কে সিনিয়র সহ আট সাংবাদিকের বিবৃতি প্রদান Logo কাহালুতে বিএনপির গণ-সংযোগ ও লিফলেট বিতরণ Logo যুবলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ চান বিএনপি জামায়াতের নাশকতা মামলার আসামী Logo সান্তাহারে ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি চক্রের সদস্য গ্রেফতার
নোটিশ ::
"বগুড়া বুলেটিন ডটকম" এ আপনাকে স্বাগতম। বগুড়ার প্রত্যেক উপজেলায় ১জন করে প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হবে। ফাঁকা উপজেলাসমূহ- সদর, শাজাহানপুর, ধনুট, শেরপুর, নন্দীগ্রাম

দেশি মাছ সংকটে ভালো নেই আত্রাইয়ের শুঁটকিপল্লীর শুঁটকি ব্যবসায়ীরা

আল আমিন মিলন, আত্রাই(নওগাঁ)প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০৭:২২:৫২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২৩
  • / 60
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

নওগাঁর আত্রাইয়ে দেশি মাছ সংকটে শুঁটকি পল্লীতে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে। কাঙ্খিত লাভের মুখ দেখতে না পাওয়ায় অনেকে এ পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে এবারে আত্রাইয়ে শুঁটকি উৎপাদন হচ্ছে অন্যান্যবছরের তুলনায় অনেক কম। অন্যান্যবছর এ মৌসুমে শুটকি উৎপাদনে ব্যাপক সরব থাকলেও এবারে নেই তাদের মাঝে আগ্রহ।

উত্তর জনপদের মৎস্য ভান্ডার খ্যাত জেলা নওগাঁ। এ জেলার আত্রাই উপজেলায় উৎপাদিত দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির ছোটমাছের শুঁটকির কদর রয়েছে দেশজুড়ে। শুধু দেশেই নয়, ভারতে রয়েছে এখানকার শুঁটকির কদর। তবে এবছর মাছের অভাবে শুঁটকি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এজন্য দুশ্চিন্তায় রয়েছেন এ পেশার সঙ্গে জড়িত প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ী। সবমিলিয়ে ভালো নেই আত্রাইয়ের শুঁটকিপল্লীর শুঁটকি ব্যবসায়ীরা।

এ উপজেলার মধ্যদিয়ে বয়ে গেছে আত্রাই নদী। পাশাপাশি রয়েছে আরও শতাধিক জলাশয়। এ বছর বন্যা না হওয়ায় আগেই নদী ও খালবিলের পানি কমে গেছে। জলাশয়ে মিলছে না দেশি প্রজাতির মাছ। এজন্য শুঁটকি উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয় ও উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, উত্তর জনপদের মৎস্য ভান্ডার হিসেবে খ্যাত স্থান সমুহের মধ্যে আত্রাইও একটি খ্যাত স্থান। প্রতিদিন শত শত টন মাছ আত্রাই থেকে রেল, সড়ক ও নৌ পথে দেশের বিভিন্ন জেলায় বাজারজাত করা হয়। সে অনুযায়ী শুঁটকি উৎপাদনেও আত্রাইয়ের যথেষ্ট প্রসিদ্ধি রয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ উত্তরাঞ্চলের রংপুর, নিলফামারী, সৈয়দপুর, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুরসহ দেশের প্রায় ১৫/২০ জেলাতে বাজারজাত করা হয় আত্রাইয়ে শুঁটকি মাছ। আর এ মাছের শুঁটকি তৈরী করে জীবিকা নির্বাহ করে প্রায় শতাধিক পরিবার। আত্রাইয়ের ভরতেঁতুলিয়া গ্রাম শুঁটকি তৈরীতে বিশেষভাবে খ্যাত। এ গ্রামের শতাধিক শুঁটকি ব্যবসায়ী এ পেশার সাথে সম্পৃক্ত। শুধু বর্ষা মৌসুমে শুঁটকি তৈরী করে তারা পরিবারের সারা বছরের ভরণপোষণ নিশ্চিত করতেন। কিন্তু এবাবে দেশি মাছের দাম বৃদ্ধির কারনে এসব শুঁটকি ব্যবসায়ীরা হাতাশ হয়ে পড়েছেন। কাঁচা মাছের আমদানী কম, বাজাররে মূল্য বেশি অথচ শুঁটকির বাজারে ধস। সবকিছু মিলে এবারে শুঁটকি ব্যবসায়য়ীরা কাঙ্খিত লাভ না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন। বিলম্বে বন্যা, নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ নিধনের ফলে দেশি মাছের এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন।

এ উপজেলায় ৪০ জন ব্যবসায়ী শুঁটকি উৎপাদন করেন বলে জানা গেছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত মাছ শুকিয়ে শুঁটকি করা হয়। আর এসব মাছ আসে আত্রাই নদী, হালতি, খৈলাবাড়িয়া, বিলসুতি, মাগুরা, ভবানীগঞ্জ জলাশয়সহ বিভিন্ন খাল-বিল থেকে।

আত্রাই উপজেলায় প্রতিবছর প্রায় ৬০০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদন হয়। আষাঢ়-শ্রাবণ মাস থেকে শুঁটকি তৈরি শুরু হয়, চলে পৌষ-মাঘ মাস পর্যন্ত। এসময় ব্যস্ত সময় পার করেন শুঁটকি ব্যবসায়ীরা। শুঁটকি তৈরি ও বাজারজাত করে যে আয় হয় তা দিয়ে সারাবছর সংসার চলে যায় ব্যবসায়ীদের।

আত্রাই রেলস্টেশন সংলগ্ন ভরতেঁতুলিয়া গ্রামটি মূলত শুঁটকির গ্রাম হিসেবে পরিচিত। এছাড়া আত্রাই আহসানগঞ্জ রেললাইনের দুইপাশে ও কেডিসি সংলগ্ন এলাকায় মাচাতে শুঁটকি মাছ শুকানো হতো। কিন্তু এ বছর মাছের অভাবে অনেক মাচা ফাঁকা পড়ে আছে।

সরেজমিনে উপজেলার শুঁটকি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের উত্তরের জেলা সৈয়দপুর, রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, জামালপুর ও ঢাকায় সরবরাহ হয় নওগাঁর শুঁটকি। তবে প্রধান বাজার ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য। এই শুঁটকি প্রথমে সৈয়দপুর যায়। এরপর সেখান থেকে ট্রেনযোগে রপ্তানি করা হয় ভারতে। তবে গতবছর বন্যা না হওয়ায় এবং খাল-বিলের পানি শুকিয়ে আসায় দেশীয় মাছে উৎপাদন কমে গেছে। এতে শুঁটকি উৎপাদন নিয়ে হতাশায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

শুঁটকি তৈরিতে ব্যবহৃত হয় পুঁটি, টাকি ও খলিসা মাছ। এক মণ পুঁটি শুকিয়ে ১৫ কেজি, চার মণ টাকি থেকে এক মণ এবং তিন মণ খলিসা মাছ শুকিয়ে এক মণ শুঁটকি হয়। বর্তমানে শুঁটকি ছোট পুঁটি ১৫০ টাকা, বড় পুঁটি ৪০০ টাকা, টাকি ৪০০-৪৫০ টাকা এবং খলিসা ২০০-২৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

শুঁটকি তৈরির প্রক্রিয়ার বিষয়ে ভরতেঁতুলিয়া গ্রামের গৃহবধূ মৌসুমি ইয়াসমিন রুনা জানান, বাজার থেকে কাঁচা মাছ কিনে নিয়ে আসার পর পরিষ্কার করে চাঁটায়ের ওপর রোদে শুকাতে হয়। গুঁড়া মাছের আঁশ ছাড়ানোর দরকার হয় না। লবণ দিয়ে পরিষ্কার করে রোদে শুকানো হয়। এক মণ মাছ শুকাতে ৩ থেকে ৪ দিন সময় লাগে।

শুঁটকি তৈরিতে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পারিশ্রমিক পান রুনা। তারমতো আরও ৩০ জন এখানে কাজ করেন। প্রতিবছর এ কাজ করে তারা বাড়তি আয় করেন। তবে এ বছর মাছের অভাবে মন্দা যাচ্ছে বলে জানান তারা।

বড়দের পাশাপাশি মাছ পরিষ্কার করে বাড়তি আয় করে শিক্ষার্থীরাও। সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী রুবিনা, সুমি ও নিশিতা জানায়, স্কুলে যাওয়ার আগে ও ছুটির পর কাঁচা মাছ থেকে আঁশ ছাড়ানো কাজ করে তারা। প্রতিদিন এ কাজ করে ৫০ থেকে ৮০ টাকা আয় হয় তাদের। কাজ করে বাড়তি আয় করায় তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে হাত খরচের টাকা নিতে হয় না।

গত আট বছর থেকে শুঁটকি ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ভরতেঁতুলিয়া গ্রামের এরশাদ আলী বলেন, এবার বন্যা না হওয়ায় মাছের আমদানি কম। উৎপাদনও কম হচ্ছে। গতবছর প্রায় দুই হাজার মণ শুঁটকি বিক্রি করেছি। লাভ ভালো ছিল। তবে এ বছর দেশি মাছের আমদানি কম থাকায় শুঁটকির উৎপাদন কম হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ বছর অর্ধেকেরও কম শুঁটকি উৎপাদন হতে পারে।

ভরতেঁতুলিয়া গ্রামের রামপদ শীল প্রায় ৩০ বছর থেকে শুঁটকি ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ ব্যবসা থেকে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। রামপদ শীল বলেন, ‘এ বছরের মতো মাছ সংকট কখনো হয়নি। বন্যা না হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছি। বাজারে যেটুকু মাছ পাওয়া যাচ্ছে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। গতবছর ৪০ টন শুঁটকি বিক্রি করেছিলাম। সেখান থেকে প্রায় আড়াই লাখ টাকার মতো লাভ পেয়েছি। এ বছর ১০ টন শুঁটকি করতে পারবো কি না সন্দেহ রয়েছে।’

আহসানগঞ্জ এলাকার আব্দুল হান্নান বলেন, ‘এ মৌসুমে রেললাইনের পাশে ও ভরতেঁতুলিয়া গ্রামে চাঁটায়ে মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করতে দেখা যেত। এ কাজে ব্যস্ত সময় পার করতেন এলাকার ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এ বছর তার উল্টো চিত্র দেখা গেছে। কিছু চাঁটাইয়ে মাছ দেখা গেলেও বেশিরভাগ চাঁটাই ফাঁকা দেখা যাচ্ছে। এর একটাই কারণ মাছের অভাব।’

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা পলাশ চন্দ্র দেবনাথ বলেন, বর্ষা মৌসুমে নিষিদ্ধ জাল দিয়ে কেউ যাতে মাছ শিকার করতে না পারে এর জন্য আমরা ব্যাপক আভিযান পরিচালনা করেছি। অনেক জাল আটক করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তারপরও বিলম্বিত বন্যার কারনে মাছের কিছুটা সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আমরা সরকারীভাবে শুঁটতি উৎপাদনকারীদের উৎসাহ প্রদান করছি।
মৎস্য কর্মকর্তা আরও বলেন, শুঁটকির সঙ্গে জড়িতদের স্বাস্থ্যসম্মতভাবে শুঁটকি তৈরিতে গতবছর একদিনের জন্য ২০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আত্রাইয়ের এই শিল্পটিকে আরও বিকশিত করতে তাদের জন্য একটি সাবমার্সিবল পাম্পের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

দেশি মাছ সংকটে ভালো নেই আত্রাইয়ের শুঁটকিপল্লীর শুঁটকি ব্যবসায়ীরা

আপডেট সময় : ০৭:২২:৫২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২৩

নওগাঁর আত্রাইয়ে দেশি মাছ সংকটে শুঁটকি পল্লীতে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে। কাঙ্খিত লাভের মুখ দেখতে না পাওয়ায় অনেকে এ পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে এবারে আত্রাইয়ে শুঁটকি উৎপাদন হচ্ছে অন্যান্যবছরের তুলনায় অনেক কম। অন্যান্যবছর এ মৌসুমে শুটকি উৎপাদনে ব্যাপক সরব থাকলেও এবারে নেই তাদের মাঝে আগ্রহ।

উত্তর জনপদের মৎস্য ভান্ডার খ্যাত জেলা নওগাঁ। এ জেলার আত্রাই উপজেলায় উৎপাদিত দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির ছোটমাছের শুঁটকির কদর রয়েছে দেশজুড়ে। শুধু দেশেই নয়, ভারতে রয়েছে এখানকার শুঁটকির কদর। তবে এবছর মাছের অভাবে শুঁটকি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এজন্য দুশ্চিন্তায় রয়েছেন এ পেশার সঙ্গে জড়িত প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ী। সবমিলিয়ে ভালো নেই আত্রাইয়ের শুঁটকিপল্লীর শুঁটকি ব্যবসায়ীরা।

এ উপজেলার মধ্যদিয়ে বয়ে গেছে আত্রাই নদী। পাশাপাশি রয়েছে আরও শতাধিক জলাশয়। এ বছর বন্যা না হওয়ায় আগেই নদী ও খালবিলের পানি কমে গেছে। জলাশয়ে মিলছে না দেশি প্রজাতির মাছ। এজন্য শুঁটকি উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয় ও উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, উত্তর জনপদের মৎস্য ভান্ডার হিসেবে খ্যাত স্থান সমুহের মধ্যে আত্রাইও একটি খ্যাত স্থান। প্রতিদিন শত শত টন মাছ আত্রাই থেকে রেল, সড়ক ও নৌ পথে দেশের বিভিন্ন জেলায় বাজারজাত করা হয়। সে অনুযায়ী শুঁটকি উৎপাদনেও আত্রাইয়ের যথেষ্ট প্রসিদ্ধি রয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ উত্তরাঞ্চলের রংপুর, নিলফামারী, সৈয়দপুর, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুরসহ দেশের প্রায় ১৫/২০ জেলাতে বাজারজাত করা হয় আত্রাইয়ে শুঁটকি মাছ। আর এ মাছের শুঁটকি তৈরী করে জীবিকা নির্বাহ করে প্রায় শতাধিক পরিবার। আত্রাইয়ের ভরতেঁতুলিয়া গ্রাম শুঁটকি তৈরীতে বিশেষভাবে খ্যাত। এ গ্রামের শতাধিক শুঁটকি ব্যবসায়ী এ পেশার সাথে সম্পৃক্ত। শুধু বর্ষা মৌসুমে শুঁটকি তৈরী করে তারা পরিবারের সারা বছরের ভরণপোষণ নিশ্চিত করতেন। কিন্তু এবাবে দেশি মাছের দাম বৃদ্ধির কারনে এসব শুঁটকি ব্যবসায়ীরা হাতাশ হয়ে পড়েছেন। কাঁচা মাছের আমদানী কম, বাজাররে মূল্য বেশি অথচ শুঁটকির বাজারে ধস। সবকিছু মিলে এবারে শুঁটকি ব্যবসায়য়ীরা কাঙ্খিত লাভ না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন। বিলম্বে বন্যা, নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ নিধনের ফলে দেশি মাছের এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন।

এ উপজেলায় ৪০ জন ব্যবসায়ী শুঁটকি উৎপাদন করেন বলে জানা গেছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত মাছ শুকিয়ে শুঁটকি করা হয়। আর এসব মাছ আসে আত্রাই নদী, হালতি, খৈলাবাড়িয়া, বিলসুতি, মাগুরা, ভবানীগঞ্জ জলাশয়সহ বিভিন্ন খাল-বিল থেকে।

আত্রাই উপজেলায় প্রতিবছর প্রায় ৬০০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদন হয়। আষাঢ়-শ্রাবণ মাস থেকে শুঁটকি তৈরি শুরু হয়, চলে পৌষ-মাঘ মাস পর্যন্ত। এসময় ব্যস্ত সময় পার করেন শুঁটকি ব্যবসায়ীরা। শুঁটকি তৈরি ও বাজারজাত করে যে আয় হয় তা দিয়ে সারাবছর সংসার চলে যায় ব্যবসায়ীদের।

আত্রাই রেলস্টেশন সংলগ্ন ভরতেঁতুলিয়া গ্রামটি মূলত শুঁটকির গ্রাম হিসেবে পরিচিত। এছাড়া আত্রাই আহসানগঞ্জ রেললাইনের দুইপাশে ও কেডিসি সংলগ্ন এলাকায় মাচাতে শুঁটকি মাছ শুকানো হতো। কিন্তু এ বছর মাছের অভাবে অনেক মাচা ফাঁকা পড়ে আছে।

সরেজমিনে উপজেলার শুঁটকি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের উত্তরের জেলা সৈয়দপুর, রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, জামালপুর ও ঢাকায় সরবরাহ হয় নওগাঁর শুঁটকি। তবে প্রধান বাজার ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য। এই শুঁটকি প্রথমে সৈয়দপুর যায়। এরপর সেখান থেকে ট্রেনযোগে রপ্তানি করা হয় ভারতে। তবে গতবছর বন্যা না হওয়ায় এবং খাল-বিলের পানি শুকিয়ে আসায় দেশীয় মাছে উৎপাদন কমে গেছে। এতে শুঁটকি উৎপাদন নিয়ে হতাশায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

শুঁটকি তৈরিতে ব্যবহৃত হয় পুঁটি, টাকি ও খলিসা মাছ। এক মণ পুঁটি শুকিয়ে ১৫ কেজি, চার মণ টাকি থেকে এক মণ এবং তিন মণ খলিসা মাছ শুকিয়ে এক মণ শুঁটকি হয়। বর্তমানে শুঁটকি ছোট পুঁটি ১৫০ টাকা, বড় পুঁটি ৪০০ টাকা, টাকি ৪০০-৪৫০ টাকা এবং খলিসা ২০০-২৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

শুঁটকি তৈরির প্রক্রিয়ার বিষয়ে ভরতেঁতুলিয়া গ্রামের গৃহবধূ মৌসুমি ইয়াসমিন রুনা জানান, বাজার থেকে কাঁচা মাছ কিনে নিয়ে আসার পর পরিষ্কার করে চাঁটায়ের ওপর রোদে শুকাতে হয়। গুঁড়া মাছের আঁশ ছাড়ানোর দরকার হয় না। লবণ দিয়ে পরিষ্কার করে রোদে শুকানো হয়। এক মণ মাছ শুকাতে ৩ থেকে ৪ দিন সময় লাগে।

শুঁটকি তৈরিতে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পারিশ্রমিক পান রুনা। তারমতো আরও ৩০ জন এখানে কাজ করেন। প্রতিবছর এ কাজ করে তারা বাড়তি আয় করেন। তবে এ বছর মাছের অভাবে মন্দা যাচ্ছে বলে জানান তারা।

বড়দের পাশাপাশি মাছ পরিষ্কার করে বাড়তি আয় করে শিক্ষার্থীরাও। সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী রুবিনা, সুমি ও নিশিতা জানায়, স্কুলে যাওয়ার আগে ও ছুটির পর কাঁচা মাছ থেকে আঁশ ছাড়ানো কাজ করে তারা। প্রতিদিন এ কাজ করে ৫০ থেকে ৮০ টাকা আয় হয় তাদের। কাজ করে বাড়তি আয় করায় তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে হাত খরচের টাকা নিতে হয় না।

গত আট বছর থেকে শুঁটকি ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ভরতেঁতুলিয়া গ্রামের এরশাদ আলী বলেন, এবার বন্যা না হওয়ায় মাছের আমদানি কম। উৎপাদনও কম হচ্ছে। গতবছর প্রায় দুই হাজার মণ শুঁটকি বিক্রি করেছি। লাভ ভালো ছিল। তবে এ বছর দেশি মাছের আমদানি কম থাকায় শুঁটকির উৎপাদন কম হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ বছর অর্ধেকেরও কম শুঁটকি উৎপাদন হতে পারে।

ভরতেঁতুলিয়া গ্রামের রামপদ শীল প্রায় ৩০ বছর থেকে শুঁটকি ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ ব্যবসা থেকে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। রামপদ শীল বলেন, ‘এ বছরের মতো মাছ সংকট কখনো হয়নি। বন্যা না হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছি। বাজারে যেটুকু মাছ পাওয়া যাচ্ছে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। গতবছর ৪০ টন শুঁটকি বিক্রি করেছিলাম। সেখান থেকে প্রায় আড়াই লাখ টাকার মতো লাভ পেয়েছি। এ বছর ১০ টন শুঁটকি করতে পারবো কি না সন্দেহ রয়েছে।’

আহসানগঞ্জ এলাকার আব্দুল হান্নান বলেন, ‘এ মৌসুমে রেললাইনের পাশে ও ভরতেঁতুলিয়া গ্রামে চাঁটায়ে মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করতে দেখা যেত। এ কাজে ব্যস্ত সময় পার করতেন এলাকার ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এ বছর তার উল্টো চিত্র দেখা গেছে। কিছু চাঁটাইয়ে মাছ দেখা গেলেও বেশিরভাগ চাঁটাই ফাঁকা দেখা যাচ্ছে। এর একটাই কারণ মাছের অভাব।’

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা পলাশ চন্দ্র দেবনাথ বলেন, বর্ষা মৌসুমে নিষিদ্ধ জাল দিয়ে কেউ যাতে মাছ শিকার করতে না পারে এর জন্য আমরা ব্যাপক আভিযান পরিচালনা করেছি। অনেক জাল আটক করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তারপরও বিলম্বিত বন্যার কারনে মাছের কিছুটা সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আমরা সরকারীভাবে শুঁটতি উৎপাদনকারীদের উৎসাহ প্রদান করছি।
মৎস্য কর্মকর্তা আরও বলেন, শুঁটকির সঙ্গে জড়িতদের স্বাস্থ্যসম্মতভাবে শুঁটকি তৈরিতে গতবছর একদিনের জন্য ২০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আত্রাইয়ের এই শিল্পটিকে আরও বিকশিত করতে তাদের জন্য একটি সাবমার্সিবল পাম্পের ব্যবস্থা করা হয়েছে।